1. b71newstv@gmail.com : Moshiur Rahman : Moshiur Rahman
  2. jmitsolution24@gmail.com : support :
বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ন

নদী, সবুজ শস্য ও সম্প্রীতির জনপদ ১০ নং দিগনগর ইউনিয়ন তথ্যসংকলন: কবি ও লেখক: নাসরিন সুলতানা রহমান

কে এম সাইফুল রহমান গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ Time View

সবুজ শস্য, নদীর স্নিগ্ধতা ও সামাজিক সম্প্রীতিতে গড়ে ওঠা এক নদীমাতৃক জনপদ- গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ১০ নং দিগনগর ইউনিয়ন। মুকসুদপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কুমার নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জনপদ কালের পরিক্রমায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষি, সেবা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সমন্বয়ে নিজস্ব গ্রামীণ ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দিগনগর ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ১৭.৮০ বর্গকিলোমিটার এবং কৃষিই এখানকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। ইউনিয়নের উৎপাদিত প্রধান ফসলের মধ্যে ধান, পাট, মাসকলাই, মটর, ছোলা, সরিষা, তিল, গমসহ বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য উল্লেখযোগ্য। ৩২টি গ্রাম ও ২৯টি মৌজা নিয়ে গঠিত এই ইউনিয়নে রয়েছে প্রায় ৫,৮০০ পরিবারের বসবাস। ২০২২ সালের আদমশুমারি-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী এখানকার জনসংখ্যা ছিল ২৭ হাজারেরও বেশি। বিশ্বম্ভরদী, ফতেপট্টি, ভাজন্দী ও দিগনগরসহ বিভিন্ন গ্রামে বিস্তৃত জনবসতি এই ইউনিয়নের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। দিগনগরের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে কুমার নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ইউনিয়নটির ৪,২৫,০০ শতাংশ জমিই আবাদের উপযুক্ত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নদীটি এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন, কৃষি ও স্থানীয় বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নদীকে ঘিরে নৌকাবাইচ, গ্রামীণ মেলা এবং বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় নদী ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দিগনগর বাজার আজও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। প্রশাসনিকভাবে মুকসুদপুর দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহাসিক জনপদ। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১৭ সালে মুকসুদপুর থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালের মৌলিক গণতন্ত্র (Basic Democracies) ব্যবস্থার অধীনে দিগনগরকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও দিগনগর ইউনিয়নের রয়েছে গৌরব ও ত্যাগের অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর উপস্থিতি ছিল এবং স্থানীয় মানুষের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনাও ঘটেছিল। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর পদ্মকান্দা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘পদ্মকান্দা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ দিগনগরের মানুষের মুক্তিযুদ্ধকালীন সাহস, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের স্মরণীয় নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। দিগনগরের সামাজিক অগ্রগতি কোনো একক ব্যক্তির অবদানে গড়ে ওঠেনি; বরং স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, দানশীলতা ও নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে এই জনপদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছে। স্থানীয়ভাবে স্মরণীয় সমাজসেবকদের মধ্যে দিগনগর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মরহুম ফজলুর রহমান মোল্লা অন্যতম। তিনি মানুষের কল্যাণ ও স্থানীয় সমাজের উন্নয়নে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং ২০১১ সালের ৫ জুলাই ইন্তেকাল করেন। এছাড়াও জসিম উদ্দীন খান, কায়সার মিয়া, রোকন উদ্দীন মোল্লা ও খোন্দকার বাছির উদ্দিনের মতো সমাজসেবকেরা জীবদ্দশায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। শিক্ষার প্রসারে ষোলোঘড়িয়া গ্রামের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রয়াত সত্য রঞ্জন রায়, যিনি ‘সত্য মাস্টার’ নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁর অবদানও স্থানীয়ভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। বৃহত্তর মুকসুদপুরের কৃতী সন্তানদের মধ্যে বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খানের নামও উল্লেখযোগ্য;

সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে উন্নতি শিক্ষা গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারি – বেসরকারি মোট ১৩ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯৫৮ সালে বাজার এবং কুমার নদকে কেন্দ্র করে শিক্ষানুরাগী সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিয়নের একমাত্র উচ্চ শিক্ষালয় আজকের ঐতিহ্য বাহী দিগনগর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৫৮)। ইউনিয়ন টিতে শিশু শিক্ষা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয় ১১ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়াও ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে দাখিল শিক্ষা গ্রহণের জন্য ১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি ‘ দিগনগর ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা” স্থাপন করা হলেও মাদ্রাসাটি ১৯৮৫ সালের ৭ জানুয়ারি স্বীকৃতি লাভ করে৷ তৃণমূলের চিকিৎসা সেবা ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১৯৮০ থেকে ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে গ্রামীণ মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নির্মিত হয় সরকারিভাবে গড়ে উঠে একটি ‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র’।। এছাড়া ১৯৯৮ ও ২০০৯ সালের সরকারি প্রকল্পের অধীনে স্থানীয় সচেতন ও দানশীল ব্যক্তিদের দান করা জমিতে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। বর্নি, ফতেপট্টি, দিগনগর, সৈদ্দী, কানুড়িয়া ও বগাইল গ্রামের এই ক্লিনিকগুলো থেকে বর্তমানে গ্রামীণ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পাচ্ছেন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছুটতে হচ্ছে দূরদূরান্তের পথে। হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য, কুমার নদীর মায়াবী রূপ আর বীরত্বগাথা ইতিহাস নিয়ে মুকসুদপুরের দিগনগর ইউনিয়ন আজও তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। স্থানীয় কৃতি ব্যক্তিত্বদের অবদান আর বর্তমান প্রজন্মের সম্মিলিত প্রয়াসে এই নদীমাতৃক জনপদ আগামীতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরও উন্নত এক আধুনিক মডেল ইউনিয়নে পরিণত হবে। এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় এলাকাবাসীর।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category